রমজানে সুস্বাস্থ্যের জন্য কিধরনের খাবার খাওয়া উচিত?
রমজানে সুস্বাস্থ্যের জন্য কিধরনের খাবার খাওয়া উচিত?
রমজান মাস, আরবি বর্ষ পঞ্জিকার নবম মাস। এই মাসে সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রোজা পালন করে থাকে। রোজা ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির মধ্যে অন্যতম। রোজা বা সওম হল সুবেহ সাদিক হইতে সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার থেকে বিরত থাকা। প্রতিবছরের মতো আবারো ফিরে এলো রমজান মাস।
রমজান মাসে টানা ১৩ থেকে ১৪ ঘন্টা পানাহার ব্যতীত থাকতে হয়। এ সময় আমাদের শরীর থেকে ঘন ঘন প্রস্রাব ও ঘাম বের হওয়ার ফলে শরীরে পানি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এসময় মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, শরীর দুর্বল হয়ে কাজের অনুপযুক্ত হয়ে যায়। এ সময় কারো কারো শরীরের গ্লুকোজ কমে যাওয়ার মত অবস্থা হতে পারে।
সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যাভ্যাস
আমাদের বাঙালি সমাজে আমরা পূর্ব থেকে ভাজাপোড়া খাওয়ায় অভ্যস্ত। বর্তমানে সকল পণ্যে ভেজাল থাকার কারণে সারাদিন রোজা রেখে এই ভাজা পোড়া আমাদের নানান রকমের সমস্যা সৃষ্টিকরে। সারাদিন রোজা রেখে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া তৈলাক্ত খাবার আমাদের পেট ফাঁপা, গলা জলা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
সারাদিন রোজা রেখে সাহারি ও ইফতারের সময় আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সঠিক খাদ্য নির্বাচন অবশ্যক। শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য আমাদের রোজা পালনে আরো সহজ করে তোলে। নিন্মের কয়েকটি খাদ্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা জেনে রাখা প্রয়োজন:
পানি বা শরবত পান করুন:
পানি আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পানি ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। খাবার হজম ও শোষণে সাহায্য করে এবং দেহ থেকে বর্জ্য পদার্থ যেমন- ইউরিয়া ও এমোনিয়া, মূত্র ও ঘামের সঙ্গে বের করে দেয়। এভাবে পানি আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে। গরমকালে সারা দিনে ঘামের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ পানি বের হয়ে যায়। সারাদিন রোজা রেখে আমাদের পক্ষে পানি পিপাসা পেটানো সম্ভব হয় না। তাই ইফতারের সময় আমাদেরকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। তবে একসাথে বেশি পানি না খেয়ে কিছুক্ষণ পরপর অল্প অল্প করে খাওয়াটাই উত্তম। রোজা রেখে ইফতারের সময় পানির ঘাটতি মেটাতে আমাদেরকে যেকোনো রসালো বা তরল খাবার যেমন-ফলের রস, চিড়ার শরবত, ডাবের পানি, সুপ ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই বাজারের কৃত্রিম রং মিশানো জুস, কোমল পানীয়, চা ও কফি এড়িয়ে চলতে হবে।
ইফতারিতে খেজুর খাওয়া:
খেজুর একজন রোজাদার মুসলমানের ইফতারির অন্যতম প্রধান খাবার। ইসলাম ধর্মে বর্ণিত আছে যে খেজুর খাওয়া সুন্নত। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স:) খেজুর দিয়ে ইফতারি করতেন।
খেজুর মিষ্টি ফল হওয়ায় দ্রুত রক্তে শর্করা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও এটি ডাইজেস্টিভ এনজাইম বিতরণকারী হিসেবে ও কাজ করে, যা আমাদের খাবার হজমে সাহায্য করে। এ ফল খালি পেটে খেলেও কোন সমস্যা হয় না। খেজুর প্রচুর পরিমাণে ভিটামিনে ভরপুর। ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় এ ফল সারাদিনের অভুক্ত শরীরের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। তাই, সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে সেহরিতেও কয়েকটি খেজুর খাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও বিশেষজ্ঞরা আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় দুটি করে খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ইফতারিতে ফলমূল খাওয়া:
ইফতারিতে অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ভাজা ফোড়া তৈলাক্ত খাওয়ার বাদ দিয়ে দেশীয় ফলমূল রাখা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। সব ধরনের ফলেই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। ফলে আছে শর্করা, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন-এ, সি, ও লৌহ। ফল সারাদিনের ক্লান্তি দূর করবে, শরীরকে করবে কর্মক্ষম সাথে পূরণ করবে পানির চাহিদা। পানির চাহিদা পূরণে ফলের কোন বিকল্প নেই। গরমের দিনে রমজান হওয়ায় খাওয়া-দাওয়ার দিকে আরো বেশি নজর দেওয়া জরুরী। রমজানে ইফতারিতে মৌসুমী ফল যেমন- আম, আপেল, কমলা, আনারস, তরমুজ, পেঁপে, কলা, আমড়া, পেয়ারা, মালটা, কামরাঙ্গা, বেল, ডাব ইত্যাদি ধরনের ফল খাওয়া যেতে পারে।
রাতের খাওয়ার ও সেহরিতে শাকসবজি:
রমজানে রাতের খাওয়ার ও সেহেরীতে নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সেহরি ও রাতের খাওয়ারে দ্রুত হজম হয় এ ধরনের খাবার খাওয়া আবশ্যক। সেহরিতে ভাতের সাথে মাছ, সবজি ও মাংস খাওয়া যেতে পারে। রাতের খাওয়ার হিসেবে আটার রুটিও খাওয়া যায়। দেশীয় সবজির মধ্যে লাউ শাক, মিষ্টি কুমড়া, পেঁপে, পটল, ঝিঙ্গে, বরবটি, পুঁইশাক, কচু শাক ইত্যাদি।
রমজানে খাদ্যাভ্যাসে আধুনিক প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশের রমজানের খাদ্যাভ্যাসে আধুনিকতার প্রভাব বেশ দৃশ্যমান। ফাস্টফুড, ইনস্ট্যান্ট খাবার এবং বিদেশি ডিশও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তন দেখা যায়, যেখানে তারা ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে আধুনিক খাবার গ্রহণ করতে আগ্রহী।
ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করুন:
রমজানে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও চর্বিযুক্ত তৈলাক্ত খাওয়ার বেশি খেলে রক্তে কোলেস্টরলের পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলে আমাদের স্বাস্থ্যের নানান ধরনের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তৈলাক্ত ও ভাজাপোড়া খাওয়ার আমাদের এসিডিটি সমস্যা প্রচুর বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রমজানের সময় আমাদের শরীর ও মন অসহিষ্ণু থাকে। স্বাস্থ্যের এই অহেতুক ঝুঁকি এড়াতে হলে আমাদেরকে এ ধরনের খাওয়া ত্যাগ করতে হবে। এছাড়াও আমাদের নিয়মিত খাদ্য অভ্যাসেও ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত খাওয়ার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী হজমে সাহায্য করে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমায় এ ধরনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা আবশ্যক।
রমজানের সময় স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা রেখেই খাওয়ার তালিকা করা উচিত। এছাড়াও দুধ, ডিম খাওয়া উচিত, কারণ খাবারে চাহিদার মত প্রোটিন ও আমিষ না থাকলে উপবাসের সময় শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
উপরে আলোচনা হল রমজানের আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। এই রমজানে আমাদের আরেকটি জরুরী বিষয় পরিমাণ মতো ঘুমানো। রমজান মাসে আমাদের সেহরি ইফতার খেলেই হবে না পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমেরও প্রয়োজন রয়েছে। পরিমাণ মতো ঘুম আমাদের শরীরও মন সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।




Comments
Post a Comment